সুখ ও আসক্তি
কাবাব বিক্রি করা এক নারী, নাসার এক গবেষকের স্বপ্ন, আর একটা মানিব্যাগে মাত্র ২৮ টাকা — এই তিনটে সূত্র ধরে খোঁজা যাক, সুখ আসলে কোথায় থাকে।
সুখী এক ভদ্রমহিলার গল্প
সুখী এক ভদ্রমহিলার একটি ভিডিও দেখলাম আজ। কোটি কোটি টাকার ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এখন মনের সুখে রাস্তায় কাবাব বিক্রি করছেন। একটি মাত্র ভিডিও দেখে যদিও কোন সিদ্ধান্তে আসা যায় না, তবুও দেখে মনে হল একজন মানুষ যেন সুখের সন্ধান পেয়ে গেছেন!
বিষয়টি আমি দেখছি নাসায় নিয়োজিত গবেষকদের নির্জন গ্রামে গিয়ে ক্ষেত-খামার করার স্বপ্নের সুবিস্তৃত বাস্তবায়নের মতো। ঐ মহিলা বাস্তব জীবনে আসলেই একজন সুখী মানুষ কিনা জানিনা, কিন্তু ঐ "কোটি কোটি" টাকার যেকোনো কিছুই যে আসলে "ক্ষতি" ছাড়া আর কোন কিছুই টেনে আনেনা, সেই বিষয়ে আমি নিশ্চিত। এই "কোটি কোটি" বলতে পুলেরঘাটের আব্দুল মোতালেব ভূইয়া বা কিশোরগঞ্জের ৪৯নং এডভোকেট আবু বকর সিদ্দিকের কোটি কোটি টাকার বিষয় থেকে বিল গেটস বা এলন মাস্ক — সকলের "কোটি কোটি" টাকার বিষয়ই বোঝানো হয়েছে। টাকা বা মুদ্রাই তো প্রাকৃতিক নয়, প্রাকৃতিক নয় সীমান্ত বা জমির আইল। কেবল সংখ্যাই প্রাকৃতিক। প্রাকৃতিক নিয়ম একটাই — যোগ করলে ধীরে আর গুণ করলে ভীষণ বৃদ্ধি পায়, বিয়োগ করলে ধীরে আর ভাগ করলে ভীষণ হ্রাস পায়। কোন এক অজানা কারণে যেমন কোন কিছু না থাকার পরিবর্তে সবকিছু থেকেছে, তেমনি এক অজানা কারণে মানুষ যোগ-গুণ বাদ দিয়ে বিয়োগ-ভাগ পছন্দ করেছেন।
এই বিয়োগ আর ভাগ বজায় রাখতেই পৃথিবীকে ভাগ করা হয়েছে সীমান্তে আর ব্যক্তিকে ভাগ করা হয়েছে মুদ্রায়। প্রাপ্ত সুবিধার ভাগ সারা পৃথিবীর সব মানুষের কাছে সমান ভাবে পৌঁছে দেয়ার উদ্দেশ্য থাকলে মঙ্গলে বসতি স্থাপন নিয়ে গর্ব করা যায়, স্বপ্ন দেখা যায়, কিন্তু উদ্দেশ্য তো সেটা নয়। নিজের সন্তানের ট্রান্সজেন্ডার হওয়াটা যেই পুরুষ মেনে নিতে পারেনা, মঙ্গল সেই পুরুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হলে আমি ধেই ধেই করে নাচবো কেন? ওতে আমাদের কী! এজন্যই বর্তমান সময়ে কোটি কোটি টাকার বিষয় মানে কোটি কোটি টাকার অশান্তি। আলহামদুলিল্লাহ, বর্তমানে আমার কিছু পুরাতন পরিধেয় আর কমদামি টাচ লাগানো একটা ফোন ছাড়া আর কিছু নেই।
ইজ্জতের প্রশ্ন
এই অবস্থায় এক কোটি কোটি টাকার মালিকের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। চুক্তি না করে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য চাবি নিয়ে সেখানে কিছু মালামাল রেখে, কয়েকদিন গায়েব থেকে, এক সুন্দর সকালে এক বড় ভাইয়ের কাছে গিয়ে চুরি হয়েছে বলে কান্নাকাটি শুরু করলেন। বড় ভাইয়ের মনটা আমার নরম। ডেকে বললেন, "এতো দেখছি নিজেদের ইজ্জতের বিষয় রে, কিছু টাকা দিয়ে দে, অসহায় একটা মেয়ে, আশা নিয়ে এসেছে" মনে মনে ভাবলাম, এই এলাকায় আমার আবার ইজ্জত ছিল কবে! ইজ্জত আছে এই সমাজের! ইজ্জত আছে রোহিঙ্গাদের। মানুষের তো এই সমাজে ইজ্জত থাকার কথা না! যাই হোক, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। এই পুরুষতান্ত্রিক, কট্টর, দুর্নীতিগ্রস্ত ঘুষে শিক্ষিত, ভিন্নমতাবলম্বীদের উজাড় করে প্রতিষ্ঠিত মানুষের সমাজে আমার বা একজন সাধারন মানুষের কোন মান-ইজ্জত নেই তবুও সমাজের বড় বড় ইজ্জতের দাম মাঝেমধ্যে দিতে হয় আমাদের মত মানুষকেও আর দুঃখটা সেখানেই। ৬৬৬ কোটি ধান্দা করে নুসের মেয়ে গলা ছেড়ে চিৎকার করা শেখে আর সেই দায় মেটাতে চাপে পরে দেশের সাধারণ বিনিয়োগকারী আর খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষগুলো।
আমি এমন আরো অনেক মানুষ চিনি যারা নিজেদের আরো "সফল" বানাতে দৌড় শুরু করেছেন সেই শৈশবে আর এখনো দৌড়ে চলেছেন উদয়াস্ত! তারা প্রথম হয়েছেন বা হবেন মেনে নিলাম, তারা কোটি কোটি টাকার মালিক তাও মেনে নিলাম কিন্তু তবুও তারা এখনো সদা ব্যস্ত কেন? প্রায় সর্বদাই তাদের মেজাজ উগ্র, মানসিকতা হিংস্র, মুখে মুখোশ, কন্ঠে তেল, অন্তরে হতাশা, চোখে লোভ আর মাথা ভরা লুকানো অভাব কেন?
সব আসক্তি একরকম নয়, ফলাফল একই
এই পৃথিবীতে যত ধরনের আসক্তি আছে, তার মধ্যে প্রাকৃতিক চিন্তা করলে টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল আর ইথানল, ক্যামিক্যাল চিন্তা করলে কোডিন আর লাইসার্জিক অ্যাসিড ছাড়া অন্য প্রাকৃতিক-অপ্রাকৃতিক, দ্রব্য বা আচরণগত প্রায় সব নেশা। যেমন ঘুষ, জুয়া, অনিয়ন্ত্রিত বা অনিরাপদ যৌনাচার, জবরদখল, শিশুকাম, ঠগবাজি, সোশ্যাল মিডিয়া, এমফিটামিন, মেথামফিটামিন হাইড্রোক্লোরাইড, নিকোটিন, অ্যালকালয়েড, ট্যানিন, টলুয়েন থেকে এসিটোন এই সব কিছুই মানুষের মানবতার বা প্রাকৃতিক পরিবেশের ভয়াবহ ক্ষতি করে।
যারা কোনদিন মাদক দিয়ে নেশা করেনা কিন্তু ঘুষ না খেয়ে চলতে পারেনা আর একটু ঘুষ খেলে পরে অপরাধীদের সহযোগিতা করতেও যাদের বিবেকে আটকায় না অথবা যেই নেশারু কোনদিন কোন মাদক নেয়নি কিন্তু অনলাইন জুয়া খেলতে খেলতে এখন ভিটেমাটি বিক্রির জন্য ক্রেতা খুঁজে অথবা যেই রাজনৈতিক পাতি নেতারা প্রভাবশালী নেতাকে ধরতে না পেরে তার পরিবারের অন্য অসুস্থ সদস্যকে তুলিয়ে নিয়ে হলেও ক্ষমতা জাহির করতে চায় তারাও কিন্তু এসবের জন্য মিথ্যা বলে, চুরি করে, স্থান-কাল-পাত্র-সমাজ ভুলে যায়, আচরণে আকস্মিক পরিবর্তন ঘটায়, নিজেকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রকাশ করে … যার সবগুলোই মাদকাসক্তদের বৈশিষ্ট্য। তাদের কাজকর্ম, চিন্তা-ভাবনা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ সবকিছু মাদকাসক্তদের মত কারন তারা আসক্ত আর গৌতম বুদ্ধ বলে গেছেন, দুঃখের মূল কারণ হলো আসক্তি।
আধুনিক গবেষণায় সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়েছে, মানুষ সাধারণত মাদকে জড়ায় কৌতূহল বা একাকীত্ব থেকে। তাদের মধ্যে যাদের মস্তিষ্কে ক্রনিক ডিপেন্ডেন্সি ধরনের অসুস্থতা আছে তারা আসক্ত হয়। এই দেশে বেশিরভাগ মাতাপিতা সন্তান জন্ম দেয় শেষ বয়সে দেখাশোনা করার লোক থাকবে এই আশায়, সন্তানেরা পড়ালেখা করে ক্লাসের সবাইকে পেছনে ফেলতে বা A+ দিয়ে একটা চেয়ার দখল করে "আজীবন সুখ"-এ থাকতে তাই ডিপেন্ডেন্সি আমাদের রক্তের কণায় কণায় বলেই এই দেশের কোন স্ত্রী-সন্তান-মাতাপিতারা সাধারণত সাধারণত নিজের পুরুষকে ঘুষ বা অনাচারে বাঁধা দেয় না।
ভাগ বড় করা, নাকি নিজেকে বড় করা?
এই সবকিছুর মূল হলো ঐ যোগ আর গুণ বাদ দিয়ে, বিয়োগ আর ভাগ পছন্দ করে, কেবল নিজের ভাগটা সবচেয়ে বড় করার মানসিকতা। যাদের সাধ্য আছে তারা বাস্তবে বড় করে, যাদের সাধ্য নেই তারা নেশা করে আর যাদের সাধ্য মোটামুটি তারা দুটোই করে অল্প অল্প। আমার অনেক পরিচিত এমন "কোটি কোটি টাকার" মালিক যেমন আছেন যারা সারাদিন সচেতন আর তটস্থ নিজের ভাগটা আরো বড় করতে, তেমনি খুব অল্প কিছু এমন মানুষও আছেন যারা নিজের কোটি কোটি টাকার চেয়ে নিজেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভাবেন। নিজের ভাগটা আরো বড় করতে তটস্থ না থেকে, নিজেকে বড় করতে, নিজেকে আরো উদার মানুষে পরিণত করতে সচেষ্ট থাকেন।
এই মানুষগুলোকেই দেখেছি প্রশান্ত থাকতে, কেবল নিজের কথা চিন্তা না করে অন্যের সুবিধা অসুবিধা নিয়ে ভাবতে, অন্যকে দেখানোর জন্য কৃত্রিম হাঁসি না দিয়ে কারণে-অকারণে ভেতর থেকে আনন্দিত হতে আর যারা মাদক, ঘুষ বা সম্পত্তির পেছনে পরে থাকে, তারা "কোটি কোটি টাকা" থাকার পরেও আজীবন অভাবে থাকে। ভেবে দেখুন, কী পরিমাণ অভাবী হলে বিল গেটসরা যৌনরোগে আক্রান্ত হয়ে সেটা নিজের স্ত্রীর কাছেও গোপন করতে বাধ্য হয় বা মাস্কদের মেনে নেয়ার ক্ষমতায় কী পরিমাণ অভাব থাকলে তারা নিজের সন্তানের বায়োলজিক্যাল আইডেনটিটি নিয়ে টানাটানি করে! তলে তলে সবাই টেম্পু থুক্কু ইয়ট নিয়ে এপ্সটিন যাবার ধান্দা করে।
দুটো গল্প, একটাই সত্য
কাবাব বিক্রি করা সেই ভদ্রমহিলা আর নাসার গবেষকদের গ্রামে ফেরার স্বপ্ন ঐ দুটোই আসলে একটি সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে। কোটি টাকার ব্যবসা হারিয়ে রাস্তায় দাঁড়ানো মানুষটা যদি সত্যিই সুখী হন, সেটা টাকা হারানোর কারণে নয় বরং আরও বাড়ানোর দৌড় থেকে ফিরে আসাতে পারার কারণে। যে গবেষক গবেষণাগার ছেড়ে ক্ষেতে নামার স্বপ্ন দেখেন তিনিও আসলে এই যোগ গুণ বিয়োগ ভাগের নেশা থেকেই মুক্তি খোঁজেন। একটা সহজ জীবনে ফিরতে চান যেখানে ভাগ করার বা সেটাকে বড় করার টান নেই।
এদেশি বংশীয়, সম্ভ্রান্তদের চুরি করতে বা ঘুষ নিতে খারাপ না লাগার ঘটনা এই একই প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করে। অভাবী হোক বা স্বভাবী আরেকটু টাকা বাড়ানোর নেশায় পরে অনেক মানুষকে এমন সব পথে যায় যা তার নিজস্ব অবস্থানের সাথে মেলে না। ভাগটা বড় করার এই তাড়না তাদের জন্য নেশার মত কাজ করে … যতই থাকুক, আজীবন আরেকটু চাই! সমাজ অবশ্য এসবে সায়ও দেয়। বড়রা আবেগে ভেসে যায়, ছোটরা তার দায় বহন করে কারণ এখন যাদের ইজ্জত আছে তাদের যেমন দিন শেষে হিসেব মেলাতে হয়, যাদের নেই তাদেরকেও না থাকার মূল্য চুকাতে হয়। এই হিসেবটা বদলাবে না সহজে কিন্তু নিজের হিসেবটা তো বদলানো যায়!
কার্ডে চাপ দিন, নিজেই আবিষ্কার করুন
আপনি কোন আসক্তি বা মানসিকতা থেকে মুক্ত হয়ে প্রশান্তি খুঁজতে চান?
২৮ টাকার প্রশান্তি
আমি জানি না, আমার পরিচিত ঐ কোটি কোটি টাকার মালিকেরা বা সেই হিংস্র পাতিনেতাদের কেউ কোনদিন প্রশান্তি খুঁজে পাবে কিনা। আসক্তি ছাড়ে না আর ভাগ বড় করার মত তীব্র নেশা নেই তবে এইটুকু দেখেছি, যারা নিজের ভাগ নয় বরং নিজেকে বড় করতে চায়, উদার মানুষ হতে চায় তারা প্রশান্ত থাকতে পারে। মানিব্যাগে মাত্র ২৮ টাকা থাকলেও আমি অন্তত এইটুকু জানি, সারাক্ষণ ভাগ বড় করার চিন্তা নিয়ে যুগের পর যুগ দোর্দন্ড প্রতাপে বাঁচার চেয়ে সকল আসক্তি থেকে মুক্ত হয়ে, পরিতৃপ্ত হৃদয় নিয়ে অল্প কিছুকাল বেঁচে থাকতে পারাটা বিশাল অর্জন।